Monday, January 21, 2019

নাজিরপুরে হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী সাজেদা বেগম



নাজিরপুর (পিরোজপুর) সংবাদদাতা : পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার চৌঠাইমহল গ্রামের সাজেদা বেগম হাঁস পালন করে এখন সচ্ছল। স্বামী আল-আমীন দুই মেয়ে ও শশুর-শ্বাশুরী নিয়ে ছয়জনের সংসার তিনি ভ্যান চালিয়ে জবিকা নির্বাহ করেন। ৬ জনের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন সাজেদা বেগমের স্বামী আল-আমীন। ২০০৯ সালে সিডর পরবর্তী (আইডিবি)-এর অর্থায়নে ফায়েল খায়ের প্রোগ্রামের মাধ্যমে মুসলিম এইড বাংলাদেশের সুদমুক্ত ঋণ দেয়ার খবর শুনে, সাজেদা বেগম ঋণ নেয়ার জন্য চৌঠাইমহল সমিতির সদস্য হন। প্রথমত ১০,০০০ টাকা ঋণ নিয়ে ১শ’ হাঁস কিনে খামার শুরু করেন সাজেদা বেগম। কিছু দিন যেতে না যেতেই হাঁসগুলো দেয়া শুরু করে ডিম। সেই ডিমগুলো সাজেদার স্বামী আল-আমীন বাজারে বিক্রী করে কিছু টাকা জমিয়ে আর ১শ’ হাঁস ক্রয় করেন বর্তমানে সাজেদা বেগম মোট ২শ’ হাঁস পালন করছেন। সাজেদা বেগম তার হাঁসের খামার প্রসার করার জন্য ক্রমান্বয়ে ২য় কিস্তিতে আরো ১৮০০০ এবং ৩য় কিস্তিতে ২০,০০০ সর্ব মোট-৪৮,০০০ টাকার ঋণ নেয়। বর্তমানে সাজেদার হাঁসের খামার থেকে দৈনিক ডিম বিক্রী করে ১৫০-১৮০ টাকা, তার প্রতি মাসে ডিম বিক্রীতে ৫/৬ হাজার টাকা আয় হয়। এই আয়ের টাকা তার সংসারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে দিয়েছে এবং সাজেদার মুখে হাসিও ফুটেছে; এখন তিনি সচ্ছল। এ ব্যাপারে সাজেদা বেগমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাকে সচ্ছলতা করতে সুদমুক্ত ঋণ অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে এবং আমি ওই সংগঠনের উপর খুবই খুশি। কারণ, আমার বিপদকালে আমাকে কেউ একটা টাকা ধারও দেয়নি। মুসলিম এইড আমাকে এক এক করে ৩ কিস্তিতে ৪৮০০০ টাকা দিয়েছে।
নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সওগাতুল ইসলাম জানান, সুদমুক্ত ঋণ অসহায়দের সচ্ছলতা করতে খুব বেশী সহায়তা করে। মুসলিম এইড-এর নাজিরপুর উপজেলা শাখার ম্যানেজার মোঃ মিজানুর রহমান জানান, সাজেদা বেগম শুধু ঋণ নয় তাকে মুসলিম এইড স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, যৌতুক প্রথা ও বাল্যবিয়ে রোধ এবং সামাজিক সচেতনতাসহ পরামর্শ ও সহযোগিতা করে  আসছে। মুসলিম এইড বাংলাদেশ নাজিরপুর উপজেলা শাখা থেকে সুদমুক্ত  ঋণ নিয়ে অনেক  দুস্থ পরিবারের সচ্ছলতা  ফিরে এসেছে।
হাঁসের খামারে রিজিয়ার স্বপ্ন পূরণ
হাঁস পালন করে সচ্ছলতা এসেছে রিজিয়া বেগমের সংসারে। শত শত হাঁসের প্যাঁক প্যাঁক শব্দে এখন মুখরিত থাকে নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জের বড়তলি গ্রামের রিজিয়ার বাড়ি। অসচ্ছলতা বলতে যা বোঝায় তা আজ আর রিজিয়া বেগমের সংসারে নেই। হাঁস এনে দিয়েছে রিজিয়ার সংসারে সুখের হাসি। তার খামারে বর্তমানে রয়েছে ৬৫০টি হাঁস। এ হাঁসের খামার করেই রিজিয়া এক এক করে পূরণ করে চলেছে তার জীবনের স্বপ্ন।
প্রায় এক যুগ আগে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন থেকে মাত্র ৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে রিজিয়া বেগম একদিন বয়সী ১০০টি হাঁসের বাচ্চার একটি খামার গড়ে তোলেন। প্রথম বছরেই রিজিয়ার এ প্রকল্পটি লাভের মুখ দেখতে পায়। তখন নতুন আশায় বুক বাঁধেন তিনি। অতঃপর দ্বিতীয় দফায় ৮ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে আরও ৩০০টি হাঁসের বাচ্চা ক্রয় করেন তিনি। রিজিয়া বেগমের স্বামী তাইজুল ইসলাম এ কাজে তাকে সহায়তা করতে থাকেন। এ অবস্থায় রিজিয়া বেগমের কাজের প্রতি আগ্রহ ও উৎসাহ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। খামারের পরিধি বড় করার জন্য বিভিন্নভাবে মূলধন সংগ্রহের চেষ্টা করতে থাকেন। রিজিয়া বেগম সব বিষয়ে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেন। তার আগ্রহ ও ইচ্ছাশক্তি দেখে পরিকল্পিত উপায়ে সঠিকভাবে খামার পরিচালনার জন্য ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন তাকে ৬ দিনব্যাপী উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করে। প্রশিক্ষণের পর ব্যবসার প্রতিটি দিক তার চোখের সামনে আয়নার মতো স্বচ্ছভাবে দৃশ্যমান হয়।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের পর রিজিয়া বেগমকে ২০ হাজার টাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ প্রদান করে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন। রিজিয়া সফলভাবে উদ্যোক্তা ঋণের প্রথম দফার ঋণ পরিশোধ করে দ্বিতীয় দফায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন রিজিয়া বেগম। এ অবস্থায় রিজিয়া বেগমের খামারে হাঁসের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৫০টিতে। সম্প্রতি হঠাৎ করেই অজ্ঞাত রোগে তার খামারের ৭০০ হাঁস মরে যায়। এতে তার হাঁসের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫০টিতে। তবু হাল ছাড়েননি রিজিয়া বেগম।
রিজিয়া বেগম জানান, হাঁসের খামারে লাভের টাকা দিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে তিনি ১২.৫ শতক জমি ক্রয় করেছেন। উদ্যোক্তা ঋণের তৃতীয় দফায় ১ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করে পরিকল্পিত উপায়ে খামারের আকার বৃদ্ধি করেছেন। খামারের আয় থেকে সংসারের বাড়তি আয় করার লক্ষ্যে ভাড়ায় চালানোর জন্য স্বামীকে একটি মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছেন। খামরের আয় দিয়ে থাকার ঘর পাকা করাসহ কিছু আসবাবপত্র ক্রয় করেছেন। এছাড়াও নিজের জন্য কিছু স্বর্ণালঙ্কার তৈরি করেছেন রিজিয়া বেগম। তার সংসারে আজ রঙিন টেলিভিশন, খাট, শোকেস, মোবাইলফোনসহ প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে। ক্রয় করেছেন একটি বিদেশি গাভী। গাভীর দুধ ও হাঁসের ডিম বিক্রি করে বেশ সচ্ছলভাবেই চলছে রিজিয়ার সংসার।
রিজিয়া জানায়, দরিদ্র পিতার সংসারে গ্রামের আর ১০টি ছেলেমেয়ের মতো বেড়ে ওঠা হয়নি তার। নানা রকম সামাজিক বঞ্চনার ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠেন রিজিয়া বেগম। মাত্র ১২ বছর বয়সে নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার বড়তলি গ্রামের আবদুল খালেকের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে তার বিয়ে হয়। সতিনের ঘরে এসে সুখী হতে পারেননি রিজিয়া বেগম। বিয়ের এক বছর পর রিজিয়ার কোলজুড়ে আসে এক পুত্রসন্তান। অভাবের সংসারে এরপর থেকে রিজিয়া বেগমের ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। স্বামী ও সতিনের নির্যাতন সইতে না পেরে বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন রিজিয়া বেগম। শুরু হয় একমাত্র ছেলেকে নিয়ে রিজিয়া বেগমের বেঁচে থাকার লড়াই। এর একবছর পর মোহনগঞ্জের বড়তলি গ্রামের মোঃ তাইজুল ইসলাম (বর্তমান স্বামী) রেজিয়াকে বিবাহ করেন। কিন্তু তাইজুলের পিতা তাদের এ বিবাহ মেনে নেয়নি। এ অবস্থায় রিজিয়া বেগম ও তার স্বামী অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেয়।
রিজিয়া বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করে এবং তার স্বামী রিকশা চালায়; চলতে থাকে তাদের সংসার। এভাবে দুঃখ-কষ্ট ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে করতে রিজিয়া বেগমের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ের সৃষ্টি হয়।
এ সময় রিজিয়া বেগম জানতে পারেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন বড়তলি গ্রামে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি পরিচালনার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। বড়তলি গ্রামের অনেক মহিলাই ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সমিতিতে সদস্য হয়ে ঋণ গ্রহণ করেছে। তারা বিভিন্ন আয়বৃদ্ধিমূলক কর্মকা- বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। রিজিয়া বেগম বড়তলি মহিলা উন্নয়ন সমিতিতে গিয়ে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের ফিল্ড অর্গানাইজারকে তার বর্তমান অবস্থার কথা জানান। এভাবে ২০০০ সালে রিজিয়া বেগম ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের বড়তলি মহিলা উন্নয়ন দলের সদস্য হন এবং সাপ্তাহিক পাঁচ টাকা করে সঞ্চয় জমা করতে থাকেন।
কয়েক মাস পর ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন হাঁস-মুরগি পালনের ওপর তিনদিনের একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। রিজিয়া বেগম ওই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন থেকে মাত্র ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে গড়ে তোলেন একটি হাঁসের খামার তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
সততা আর অধ্যবসায়ের ফলে একেবারে শূন্য থেকে আজ একটি সচ্ছল জীবন নিশ্চিত করতে পেরেছেন রিজিয়া বেগম। একজন সফল উদ্যোগী নারী হিসেবে তিনি এখন এলাকার অন্য নারীদের কাছে অনুকরণীয়। রিজিয়া বেগমের এ উদ্যোগটির চাহিদা কখনও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। রিজিয়া বেগম বিশ্বাস করেন বড় ধরনের ঋণ পেলে আগামীতে তার এ খামার আরও বড় করতে পারবেন।

No comments:

Post a Comment

কোয়েল পালন সম্পর্কিতপ্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্নঃ  কোয়েল কত দিনে ডিম দেয় ? উত্তরঃ  কোয়েল পাখি সাধারনত ৪৫ দিন বয়স থেকে ডিম দিতে শুরু করে । তবে বাস্তবে প্রায় ৫৫ - ৬০ দিন সময় লেগে ...